মোবাইল সিমের নতুন যুগ নিয়ে আসছে ই-সিম

জিএসএম স্ট্যান্ডার্ডের আবির্ভাবের পর থেকেই মোবাইল ফোনের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সিম কার্ড। মোবাইল অপারেটরের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মূলত এই সিম কার্ডই মূল ভূমিকা পালন করে চলেছে। এটিই মূলত মোবাইল গ্রাহকের মূল পরিচিতি যন্ত্রাংশ হিসেবেকাজ করে থাকে। তবে এতদিনে এসে বোধহয় সেই সিম কার্ডের প্রয়োজনীয়তা ফুরোলো। ‘ই-সিম’ শীর্ষক নতুন এক স্ট্যান্ডার্ডসিম কার্ডকেও ভার্চুয়াল করে তোলার কথা জানিয়েছে। সিম কার্ডের বিকল্প এই প্রযুক্তি নিয়ে জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব

কম্পিউটার, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্য এবং সেবার মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের জীবনযাত্রাকে আরওসহজ এবং ঝামেলামুক্ত করে তোলা। একটা সময়ে ল্যান্ড ফোনের বহুল ব্যবহার থাকলেও তাই যোগাযোগ মাধ্যমকে আরও বেশি সহজ ও স্বচ্ছন্দ্য করে তুলতে আবির্ভাব ঘটে মোবাইল ফোনের। মোবাইল ফোনে মোবাইল অপারেটর কর্তৃক গ্রাহকের পরিচয় সূচক যে ডিভাইস ব্যবহূত হয়ে থাকে সেটিই মূলত সিম (সাবস্ক্রাইবার আইডেনটিটি মডিউল) কার্ড। সিডিএমএ স্ট্যান্ডার্ডে ফিজিক্যাল কোনো সিম কার্ড ব্যবহূত না হয়ে মোবাইল হ্যান্ডসেটেই অপারেটরের এসব পরিচয় সূচক তথ্যগুলো পাঞ্চ করা থাকে। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মোবাইল হ্যান্ডসেটেকে একটি মোবাইল অপারেটরের সেবাই ব্যবহার করা যায়। জিএসএম স্ট্যান্ডার্ড এসে এই প্রবণতা বদলে দেয়। এই স্ট্যান্ডার্ডে মোবাইল হ্যান্ডসেটে ফিজিক্যাল একটি সিম কার্ড স্থাপনের স্লট তৈরি করা হয়। আর সিম কার্ডটি মোবাইল অপারেটরগুলো নিজেদের মতো করে তৈরি করে দেয়। ফলে জিএসএম সেবা প্রদান করে এমন যেকোনো অপারেটরের সিম কার্ডই ব্যবহারকরা যায় জিএসএম সমর্থিত মোবাইল হ্যান্ডসেটে। জিএসএম স্ট্যান্ডার্ড আবির্ভাবের পর থেকে এটিই বিশ্বব্যাপী সবচেয়েবেশি ব্যবহূত মোবাইল স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে।

জিএসএম স্ট্যান্ডার্ড প্রচলনের পর থেকেই সিম কার্ডের ব্যবহার শুরু। একটা সময় পর্যন্ত এই সিম কার্ডের আকার বড় থাকলেও ক্রমে এর আকার ছোট হতে শুরু করে মোবাইল ডিভাইসে ব্যবহারের সুবিধার্থে। দিন দিন মোবাইল হ্যান্ডসেটের আকার ছোট হতে শুরু করলে এবং আধুনা স্মার্টফোনের যুগে এসে মোবাইলহ্যান্ডসেটগুলো স্লিম হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করলে এতে ব্যবহূত প্রতিটি যন্ত্রাংশকেই ক্ষুদ্র ফর্ম ফ্যাক্টরে তৈরির প্রবণতা শুরুহয়। সেইসাথে শুরু হয় সিম কার্ডের আকার ছোট হওয়া। এই হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে ক্ষুদ্র আকারের সিম কার্ড হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে ন্যানো সিম, যাতে মূলত সিম কার্ডের মূল চিপটিই থাকে। এবারে ফিজিক্যাল সিম কার্ডের এই ব্যবহারই শেষ হতে চলেছে। বিশ্বের শীর্ষ দুই মোবাইল হ্যান্ডসেট নির্মাতা অ্যাপল এবং স্যামসাংয়ের উদ্যোগেই মূলত সিম কার্ডের বিকল্প হিসেবে চালু হতে চলেছে ‘ই-সিম’। ভবিষ্যতের স্মার্টফোনগুলোকে তারা এই ই-সিম ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করার পরিকল্পনার কথাই জানিয়েছে।

ই-সিম কী?

ই-সিম বা ইলেক্ট্রনিক সিম হলো মোবাইল যোগাযোগের নতুন একটি স্ট্যান্ডার্ড। জিএসএম স্ট্যান্ডার্ডের উদ্ভাবক জিএসএম অ্যাসোসিয়েশনই মূলত নতুন এই মোবাইল যোগাযোগ স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এই স্ট্যান্ডার্ডে মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলোকে ফিজিক্যাল সিম কার্ডের বদলে ব্যবহার করা হবে এমবেডেড সিম। এমবেডেড হওয়ার অর্থ হলো মোবাইল হ্যান্ডসেট থেকে এই সিম কখনই খুলে ফেলা যাবে না এবং তার দরকারও হবে না। এর কারণ হলো—মোবাইল অপারেটরগুলো এই স্ট্যান্ডার্ড সমর্থন করলে এইসিম থেকে একটি কল করার মাধ্যমেই পরিবর্তন করে ফেলা যাবে মোবাইল অপারেটর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এখন হয়তো আপনি একটি মোবাইল হ্যান্ডসেটে গ্রামীণফোনের সিম ব্যবহার করেথাকেন। এখন আপনাকে বাংলালিংকের মোবাইল সেবা ব্যবহার করতে হলে গ্রামীণফোনের সিম কার্ডটি খুলে ফেলে বাংলালিংকের একটি সিম কার্ড প্রবেশ করাতে হবে। মোবাইল হ্যান্ডসেটে ই-সিম ব্যবহূত হলে যেকোনো সময় একটি কল করে বা একটি এসএমএস পাঠিয়েই নির্দিষ্ট কোনো মোবাইল অপারেটরের সেবা গ্রহণ করা যাবে। কম ঝামেলায় মোবাইল হ্যান্ডসেটে একাধিক মোবাইল অপারেটরের সেবা গ্রহণের জন্য হ্যান্ডসেটগুলোকে একসাথে দুইটি বা তিনটি সিম ব্যবহারের সুবিধাও চালু রয়েছে। ই-সিম আসলে মোবাইল হ্যান্ডসেটে এমন একাধিক সিমের জন্য বাড়তি জায়গা খরচের প্রয়োজনও হবে না।

মোবাইল হ্যান্ডসেট বা অন্যান্য প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতারাও ই-সিম স্ট্যান্ডার্ডকেই সুবিধাজনক মনে করছেন। কেননা, ইন্টারনেট অব থিংসের এই যুগে এসে এখন মোবাইল ফোনের বাইরেও নানা ধরনের কানেক্টেড ডিভাইস তৈরি করা হচ্ছে। ই-সিমের ব্যবহার শুরু হলে মোবাইল হ্যান্ডসেটেরবাইরেও এসব ডিভাইসে সহজেই ই-সিম ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হবে এবং এতে করে কানেক্টেড এসব ডিভাইসেও মোবাইল অপারেটরগুলোর ভ্যালু অ্যাডেড সেবা গ্রহণ করা যাবে।

সব অপারেটরের জন্য ই-সিম

জিএসএম স্ট্যান্ডার্ডের মতো ই-সিম স্ট্যান্ডার্ড নিয়েও কাজ করছে জিএসএম অ্যাসোসিয়েশন। সকল হ্যান্ডসেট নির্মাতা এবং মোবাইল অপারেটরের সাথেই তারা এই স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে কাজ করছে। ফলে সকল মোবাইল নির্মাতা ও মোবাইল অপারেটরের জন্য এটি সার্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে কাজ করবে। তবে এই স্ট্যান্ডার্ডকেকাজে লাগিয়ে বিশেষায়িত ই-সিম তৈরিও সম্ভব। যেমন—এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে লক্ষ্য করে অ্যাপলের আইপ্যাডেব্যবহারের উপযোগী অ্যাপল সিম তৈরির পরিকল্পনার কথা জানা গেছে অ্যাপলের কাছ থেকে। তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে ই-সিম জিএসএম স্ট্যান্ডার্ডকেই সমর্থন করবে বলে জানা গেছে।

গ্রাহকদের সুবিধাই-

সিমের বড় সুবিধাটির কথা আগেই বলা হয়ে গেছে। এই সিম ব্যবহারের ফলে মোবাইল অপারেটরবদল করার জন্য গ্রাহককে কোনো বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে না। অনেক দেশেই মোবাইল অপারেটরদেরসাথে গ্রাহকদের বিভিন্ন মেয়াদের চুক্তি থাকে। ই-সিম ব্যবহারের ফলে এ ধরনের চুক্তিতেও যেতে হবে না গ্রাহকদের। আবার ডিভাইস বদলেরক্ষেত্রেও ঝামেলা কমবে গ্রাহকদের। এখন হয়তো আপনার হ্যান্ডসেটটি মাইক্রো সিম সমর্থন করে। আপনার নতুন ডিভাইস ন্যানো সিম সমর্থন করলে মাইক্রো সিমকে ন্যানো সিমে রূপান্তর করতে হবে। আর আপনার বর্তমান হ্যান্ডসেট ন্যানো সিম এবং নতুন হ্যান্ডসেট মাইক্রো সিম সমর্থন করলে আপনাকে সিমটিই নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে অপারেটরের কাছ থেকে। ই-সিম প্রবর্তিত হলে সেক্ষেত্রে নতুন হ্যান্ডসেটটিকে রেজিস্ট্রেশন করে নিলেই ঝামেলা শেষ।

আইফোন ৭ ও নতুন গ্যালাক্সি ডিভাইসে আসছে ই-সিম

ই-সিম স্ট্যান্ডার্ডের নানা ধরনের সুবিধা থাকলেও এই স্ট্যান্ডার্ডের জন্য মোবাইল হ্যান্ডসেটে নতুন ধরনের হার্ডওয়্যার কনফিগারেশন প্রয়োজন। এরই মধ্যে জিএসএম অ্যাসোসিয়েশন এই স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে মোবাইল হ্যান্ডসেট নির্মাতা ও অপারেটরদের সাথে আলোচনা শুরু করলেও সকলের দিক থেকে সর্বোত সম্মতি এখনও পাওয়া যায়নি। আর সম্মতি মিললেও এই স্ট্যান্ডার্ডকে বাজারে আসার উপযোগী করে তুলতে বছরখানেক সময় লাগবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। তবে অ্যাপল এবং স্যামসাং এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে ই-সিম নিয়ে। অ্যাপলের আইপ্যাডের জন্য অ্যাপল সিমের কথা আগেই বলা হয়েছে। তবে আইফোন ৭-এর মাধ্যমেই সার্বজনীন ই-সিমস্ট্যান্ডার্ড ব্যবহারের কথা জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এবং ফোর্বস। স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি নোট ৫-এর মাধ্যমে সম্ভবত প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে ব্যবহূত হতে যাচ্ছে এই প্রযুক্তি। সেক্ষেত্রে আসছে ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতেই হাজিরহবে ই-সিমের নতুন এই স্ট্যান্ডার্ড—এমনটিই আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে হয়তো বছরখানেক পর থেকেই সিম কার্ডের বিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে।

No Responses

Write a response