চোখের কৃমি লোয়া লোয়া

EYE--Loa-Loa

চোখের কৃমি লোয়া লোয়া। ফিতের মতো দেখতে। গায়ের বর্ণ সাদা। প্রাণীদেহে পরজীবী হিসেবে বসবাসকারী এমন দীর্ঘ কৃমি সচরাচর দেখা যায় না। নামে চোখের কৃমি বলা হলেও, এর বিচরণক্ষেত্র অনেক। চোখ, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, চামড়ার নিচে চর্বির স্তর, পুরুষের অণ্ডকোষসহ আরও অনেক সংবেদনশীল স্থানে এটা ঘুরে বেড়ায়। এ সময় প্রচণ্ড প্রদাহ সৃষ্টি করে।

লোয়া লোয়ার সংক্রমণে অন্ধত্ব বরণের ইতিহাস আছে। এ কৃমি চোখের রেটিনায় আশ্রয় নিয়ে ধীরে ধীরে তার অংশবিশেষ গলঃধকরণ করতে শুরু করে। চোখের ওই অংশ থেকে তাকে অপসারণ করা কঠিন। কদাচ চোখের ওপরের পর্দা বা কনজাংটিভায় চলে আসে তা। তবে সর্বোচ্চ মিনিট পনেরো সেখানে অবস্থান করে। ঠিক সেই সময়টিকে ধরে অনেক অসফল অস্ত্রোপচারের রেকর্ডও আছে।

বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিকদের মধ্যে কয়েকজনের এ রোগ উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে দেশের কাছাকাছি মালদ্বীপ ও মিয়ানমারের কিছু অংশে এর উপস্থিতি যেহেতু লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং জেনে রাখা অসঙ্গত নয়। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার ১০টিরও অধিক দেশে এ রোগ রীতিমতো সাধারণ। যদিও তা দুরারোগ্য এবং মারণরোগ হিসেবে উপস্থিত। এ কৃমির বিরুদ্ধে মানুষের প্রধান দুর্বলতা হলো, এর উপস্থিতি প্রায় লক্ষণশূন্য।

লক্ষণশূন্য হয়েই দীর্ঘদিন শরীরে অবস্থান করে, ধীরে পরিণত বয়সে আসে। পুরুষ লোয়া লোয়া ০.৪ মিলিমিটার বেড় নিয়ে প্রায় ৪০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যে গিয়ে থামে। নারী লোয়া লোয়ার দৈর্ঘ্য ৭০ মিলিমিটারে গিয়ে থামে, বেড় ০.৫ মিলিমিটার। বলতে গেলে দৈত্যাকৃতির কৃমি। বিশাল শরীর নিয়ে যখন মানুষ বা প্রাণির দেহে সে স্থান পরিবর্তন শুরু করে, তখন ব্যথার শেষ থাকে না। রক্তজালক, ত্বক, চর্বির স্তর, অন্ত্র কেটে পথ করে সে এগোতে থাকে। শিক্ষাটা পায় শৈশবেই।

উষ্ণ, বৃষ্টিবহুল দেশগুলোয় সচরাচর হরিণমাছি এবং আমের মাছি থেকে এ কৃমি বেশি ছড়ায়। দুই মাছিকেই খাবারের প্রয়োজনে মানুষ বা উষ্ণ রক্তের প্রাণির কাছে আসতে হয়। কারণ রক্ত তাদের খাদ্য বা পেয়। মশার মতো এদের সূক্ষ্ম চোষক নেই। এরা সরাসরি দাঁত নামিয়ে দেয়। এদের বুকে বা কণ্ঠে ওঁৎ পেতে থাকে লোয়া লোয়ার লার্ভা। রক্ত খাওয়ার মুহূর্তে তারা ওই দেহে ঢুকে পড়ে।

এরপর রক্তের ভেতর অরিয়ে গড়িয়ে দিনভর চলাচল করতে থাকে, পুরো শরীরটাকে চিনে নেয়। রাতে আশ্রয় নেয় ফুসফুসে। তাই রাতের বেলায় ডাক্তারের নেয়া রক্তে লোয়া লোয়া দেখা যায় না। দিনের বেলায় নেয়া রক্তে দেখা যায়। লার্ভা অবস্থা থেকেই এরা লিম্ফ নোডগুলোতে জমতে থাকে। গিঁটে গিঁটে, মগজে বা চোখের রেটিনায়, পোষকের ভাগ্য ভালো হলে চামড়ার নিচে আশ্রয় নেয়।

চামড়ার চর্বিতে আশ্রয় নিয়ে সেখানে বড় হতে থাকে, বর্জ্য ত্যাগ করে। তখন প্রদাহ হয়, ফুলে ও ফুটো হয়ে পুঁজ গড়াতে পারে। লিম্ফনোডে গিয়ে জমলেও ত্বক ফুলে যায়, প্রদাহ সেখানেও। তরল নিঃসরণও হতে পারে। মগজে পৌঁছে গেলে খবর আছে। পেরিফেরাল অ্যাটাক। চোখে গেলে রেটিনা খেয়ে ওটা বাড়তে থাকে। ১৭৭০ ও ৭৮ সালে তাকে প্রথম চোখে দেখা, অতঃপর ধরতে পারা যায়।

লক্ষণ
মোটামুটি শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে লক্ষণ প্রকাশ করলে বনি আদম ওই অসহায় মুহূর্তে যা যা অনুভব করে, তার তালিকা অনেকটা এমন-
ক. চোখে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হতে থাকে।
খ. তলপেটে ভয়াবহ ব্যথা, কারণ অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত।
গ. অণ্ডকোষ ফুলে বড় হয়ে যায়, ব্যথা হয়, তরলও নিঃসৃত হতে পারে।
ঘ. বগল, জঙ্ঘা প্রভৃতি স্থানে ফুলে যায়, ব্যথা হয়, তরল নিঃসৃত হয়।
ঙ. হঠাৎ কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে।
চ. গিঁটে গিঁটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, ঠিক বাতের মতো।

চিকিৎসা
সেরের ওপর সোয়া সের। লোয়া লোয়া থেকে বাঁচতে গিয়ে ওষুধ খেয়ে মৃত্যুবরণের রেকর্ডও আছে। মূলত দু’টো ওষুধের সতর্ক ডোজ ব্যবহার করে এর চিকিৎসা করা হয়। ডাই-ইথাইল-কার্বামাইজিন, আইভারমেকটিন। ডাই-ইথাইল-কার্বামাইজিন ব্যবহারের একটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে, এটি মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে সুযোগ মতো কৃমির সাধারণ ওষুধ অ্যালবেনডোজল ব্যবহৃত হয়।

চোখের নাম নিয়ে লেখা শুরু করা হয়েছিল। তা দিয়েই শেষ হোক। কৃমি ঘুরে বেড়াতে গিয়ে চোখের কনজাংটিভা বা দৃশ্যমান এলাকায় চলে তাকে চিমটা দিয়ে ধরে বের করে আনার রেকর্ড আছে। তবে এ অস্ত্রোপচার করতে হয় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। প্রায় পনেরো মিনিটের মধ্যে। আর সতর্কতার সঙ্গে তো বটেই। চোখ বলে কথা।

– See more at: http://www.bdallnews24.com/article/13606/#sthash.AZGFUATI.dpuf

সোর্সঃ ইন্টারনেট

No Responses

Write a response