এ্যাকড বাস্তবতা, আমাদের প্রে্ক্ষাপট ও ভবিষ্যত বাস্তবতা

২৪শে এপ্রিল ২০১২ইং তারিখের তাজরীন ফ্যাশন এ অগ্নিকান্ডজনিত মর্মান্তিক প্রানহানি ও ২৪শে এপ্রিল ২০১৩ ইং তারিখের রানা প্লাজা ধ্বস-এ হৃদয়বিদারক প্রানহানি ও ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে ২০১৩ ইং সনের নভেম্বর মাসে বিদেশি ক্রেতাদের দ্বারা গঠিত হয় এ্যাকড ফাউন্ডেশন।উদ্দেশ্য আগামি ৫ বৎসরে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কারখানায় নিরাপদ কম‘পরিবেশ তৈরি করা ।
এলক্ষ্যে এ্যাকড কতৃপক্ষ একটি নৗতিমালা তৈরী করে ।প্রশ্ন হচ্ছে কিসের ভিত্তিতে, কোন বাস্তবতায় এই নীতিমালা তৈরী করা হইছে?
এই নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ক্রেতা , কারখানা মালিক , কারখানা ব্যবস্হাপক , শ্রমিক ও সরকার (রাষ্টীয় আইন) এর সমন্বয়।
কিন্তু এ্যাকড এর চলমান নীতিমালার আলোকে বলতে হয় নীতিমালাগুলি সম্পুন্ন একতরফাভাবে করা হইছে যাতে বিদেশি ক্রেতাদের মনোনীত বিশেষজ্ঞরা তাদের উচ্চতর কর্মসংস্হানকে প্রাধান্য দিয়েছে ।যুক্তির খাতিরে যে অপ্রিয় সত্য কথাটি আমি বলতে পারি তা হল তাজরীন ফ্যাশন-এ অগ্নিকান্ডে ও রানা প্লাজা ধ্বস-এ যত লোক কবরে গিয়াছে তাহাদের উছিলায় বহুগুন লোক এখন বিমানে চড়তেছে বা রাজকীয় জীবন-যাপন করতেছে।
নীতিমালা তৈরীর আগে প্রয়োজন ছিল
১) কারখানাগুলির বাস্তব অবস্তা সংগ্রহ করা বা পর্যালোচনা করা।
অর্থাৎ BSCI ওযেবসাইড থেকে কারখানাগুলির পুর্ন্ ডাটা পর্যালোচনা করা যাইত।
২) স্হানীয় প্রশাসনিক/আমলাতান্তিক জটিলতা অনুধাবন না করা।
অর্থাৎ সমস্ত ক্রেতারাই আমাদের প্রশাসনিক অবকাঠামো/জটিলতা সম্পর্কে অবগত, তাহলে তাদের দ্বারা গঠিত এ্যাকড কি এটা অনুধাবন করে?
৩) র্পুন সংস্কারের জন্য আর্থিক প্রয়োজনীয়তা ।
অর্থাৎ অনেক কারখানায় নুতন করে অনেক কিছু সংযোজন করতে হচ্ছে আবার অনেক কিছু প্রতিস্হাপন করতে হচ্ছে, এজন্য কারখানাকে আর্থিক সংকুলান করতে হচ্ছে।যদি কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সরকার-মালিকপক্ষ-এ্যাকড দীর্ঘমেয়াদী সুদবিহীন/স্বল্পসুদে একটি প্রয়োজনীয় তহবিল গঠন করত তাহলে আর্থিক সমস্যার সমাধান করা যাইত। উল্লেখ্য সংস্কারের জন্য এ্যাকড-এর যে তহবিল তাহা শর্ত্সাপেক্ষ-অপ্রতুল , বলা যায় অনেকটা লোক দেখানো ।
মজার ব্যপার হল ২০১৫ সনে এ্যাকড-এর সংস্কার আরম্ব হয়, আর ২০১৫ সনে ইউরোপীয় মুদ্রা ইয়োরোর প্রায় ১৮% অবমুল্যায়নের ফলে ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের মুল্য ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয় যা এখনো চলমান।আমি ১৯৮৮ সনে পোশাক শিল্পে যোগদান করে ১৯৯৪ সন থেকে কারখানা পরিচালনা করি,দীর্ঘ্ অভিজ্ঞতা ও হিসাব-নিকাসের আলোকে বলতে পারবো একটি কারখানা সর্ব্বোচছ ৩% থেকে ৫% লাভ করত, ২/৪ টি অর্ডারে হয়ত ১০% থেকে ১২% লাভ থাকত, বৎসর শেষে কোন ক্রমেই তাহা ৫% এর অধিক হইত না , এই পরিস্হিতিতে ছোট কারখানাগুলি প্রায় সবই বন্ধ হয়ে গেছে আর বড় কারখানাগুলি যদি কাজ না নেয় তাহলে যে পরিমান লোকসান হবে কাজ নিলে শুধু লোকসান কমবে এই জন্য কাজ নেয়, বড় কারখানা হয়ত অনেকে বন্ধ করতে চাইলেও বন্ধ করতে পারতেছেনা যেহেতু ব্যাংকলোন-গ্যাস/বিদ্যুতের নির্ধারিত বিল নিয়ে বিশাল দায়-এর মধ্যে পড়ে আছে।এই পরিস্হিতিতে আবার নিজস্ব অর্থায়নে এ্যাকড-এর সংস্কার করতে হচেছ।
৩) স্হানীয় আইন সংশোধনের অনুভব।
অর্থাৎ এ্যাকড-এর সংস্কার নিতিমালায় এমন কিছু বিষয় আছে যাহা কারখানার বর্ত্তমান অবকাঠামোতে বাস্তবায়ন করা রিতিমত অসম্ভব অথবা কষ্টসাধ্য অথবা ঝুকিপূর্ন্ , যেমন বৈদ্যুতিক পাওয়ার ষ্টেশন , বয়লার , জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ডিষ্টিবিউশন বক্স।ধরা যাক একটি কারখানার শুধু জেনারেটর ছাড়া সবকিছু এ্যাকড নিতিমালায় সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব , ঐ অবস্হায় জেনারেটরের সমাধান কি?। এই অবস্হায় ঐ কারখানার পাশ্ববর্তী ভুমি বা স্হাপনা অধিগ্রহনের মাধ্যমে জেনারেটরটি নিরাপদ স্হানে স্হাপন করে সুন্দর সমাধান করা যাইত । যদি এ্যাকড কর্তৃপক্ষ সরকার এর সাথে বসত আর যেহেতু পোশাক কারখানা বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জ্ন করে তাই বাংলাদেশ সরকার জাতীয় স্বার্থে এ্যাকড নিতিমালা বাস্তবায়নের জন্য ভুমি বা স্হাপনা অধিগ্রহনের জন্য আইন করে নিত । কারখানার পার্শ্ববর্তী ভুমি অধিগ্রহন আইনের মাধ্যমে এ্যাকড-এর নিরাপদ স্হাপনার নিতিমালা পূর্ন্ বাস্তবায়ন করা যাইত , প্রয়োজন হইলে নুতন ভবনও নির্মান করা যাইত।
৪) শ্রমিক-কর্ম্চারীদের নিরাপদ কর্ম্পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতন
আমি যখন ১৯৮৮ সনে পোশাক কারখানায় যোগদান করি শুধু এইটুকুই বলব তখনকার একটি কারখানার ফিনিসিং ( যে কোন কারখানার সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচন্ন ফ্লোর) হইতে এখনকার বাথ রুম/ওয়াশ রুম আরো অনেক পরিষ্কার। আর একটা বাস্তবতা হইল যে ছেলে-মেয়ে গুলি এই বাথ রুম/ওয়াশ রুম ব্যবহার করে তাদের অধিকাংশের বাড়িতে বাথ রুম/ওয়াশ রুম বলতে কিছু নাই।
যে দেশে যত বেশি রাষ্টীয় অবকাঠামো উন্নয়ন হবে , যত বেশী আর্ত্-সামাজিক অবস্হার উন্নয়ন হবে সেই দেশের তত বেশী সচেতন হবে , এই বাস্হবতা অস্বীকার করার উপায় নাই।এ্যাকড বা বিএসসিআই এর পক্ষ হইতে যারা পরিদর্শ্ন-এ আসেন তারা কি এই বাস্হবতা বুজেন বা জানেন ??? যে দেশে শিশু শ্রম পাওয়া যায় সেই দেশে পিতা-মাতাই তার সন্তানের অধিকার দিতে অক্ষম, সেই দেশের সরকারও পারে না তার নাগরিকদের অধিকার দিতে, তাহলে সেই দেশে শ্রমিক কিভাবে মালিকের কাছ থেকে অধিকিার আদায় করবে – এই বাস্তবতা অনুধাবন না করা।বর্ত্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে শুধু পোশাক শিল্প শ্রমিকই নয় পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিকের ন্যয্য অধিকার / ন্যয্য পাওনা পাওয়া সম্ভব। আর এজন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্টকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে।
উদাহরনস্বরূপ সমস্ত শ্রমিকের আঙ্গুলের ছাপযুক্ত ইলেকট্রনিক ডাটাবেস করতে হবে। পোশাক রপ্তানীর সময় সরকার রপ্তানীমূল্যের উপর কর কাটে তদ্রুপভাবে যদি শ্রমিকদের বাৎসরিক পাওনাও যদি কেটে রাখে তাহলে শ্রমিকরা সরকারের কাছ থেকে পাওনা বুজে নিতে পারত।
তাহলে আমি বলব এ্যাকড বিশেষগ্গগন শুধু সচেতন করতেছেন, কিন্তু কোন দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেছেন না।
৫) কিছু ক্ষে্ত্রে অতি নিরাপত্তা –
এ্যাকড-এর অগ্নি নিরাপত্তা নীতির একটি হল প্রতিটি ফ্লোর এর প্রতিটি গেট-এ অগ্নিনিরোধ দরজা ( ফায়ার ডোর) লাগাতে হবে। প্রথমে নিয়ম ছিল দরজা সবসময় বন্ধ থাকবে , কেউ গেলে খুলবে এবং নিজে থেকেই বস্ধ হবে। আমার পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রথম পরিদর্শ্ন এর সময় পরিদর্শ্ক টীমকে জিগ্গসা করেছিলাম যে ধরেন আমার একটি ফ্লোরে ৩০০ শ্রমিক আছে , ৩০০ শ্রমিক সকালে ডুকবে , দুপুরে বিরতিতে যাবে , আবার আসবে , ছুটির পর আবার যাবে , তাহলে দৈনিক ১২০০ বার দরজা খুলবে আবার লাগবে, এভাবে দরজাগুলি কতদিন টিকবে, আর বিপদের মূহুর্তে যদি কোন একটি না খুলে তখন কি অবস্হা হবে। দূঃখজনক হল পরিদর্শ্ক টীম থেকে কোন উত্তর পাই নাই।
এখন আবার দরজার সাথে ম্যজনেটিক কন্টাক্ট লাগানো হইছে।উচিত ছিল একটি ফ্লোরে যদি ২টি গেট থাকত তাহলে একটি গেট-এ আর ২ এর অধিক থাকলে সব্বোচ্চ ২টিতে অগ্নিনিরোধ দরজা লাগানো , তাহলে অন্য দরজা দিয়ে সহজে মালামাল উঠা-নামা করা যাইত , আবার অগ্নিনিরোধ দরজার আশে-পাশের সমস্ত জানালাগুলি বন্ধ করে সেখানে ইট দিযে ওয়াল করতে হইছে, তাতে ফ্লোরে বাতাসের প্রবাহ কমে গরম বারছে।
এইরকম আরও অনেক নীতিমালা আছে যেগুলি আমাদের আবহাওয়ার সাথে সামজষ্য্ না।
এ্যাকড কার্য্ক্রমের বাহিরে আবার আছে বিভিন্ন ক্রেতার বিভিন্ন রকম বিধিনিষেধ , নুতন নুতন চাহিদা বা সার্টিফিকেট যার পিছনেও অনেক অর্থ্ ব্যয় করতে হয়।
২০০৬ সনের BSCI কার্য্ক্রম শুরুর থেকে এখন পর্য্ন্ত যে অবস্হা চলমান তাতে অবস্হা অনেকটা এইরকম যে পোশাক শিল্প মালিকদের হাত-পা বেধেঁ আস্তে আস্তে ঝুলানো হচেছ আর সাথে সাথে এই শিল্পও ঝুলবে , ঝুলতে থাকবে এর ভবিষ্যতও , আর ভবিষ্যতই বলতে পারবে কতদিন ঝুলে থাকবে এর ভবিষ্যত , এর সাথে সংশ্লিষট শ্রমিক-কর্ম্চারীর ভবিষ্রত।

1

No Responses

Write a response