আয়ুর্বেদ সম্পর্কে কিছু কথা

আয়ুর্বেদ সম্পর্কে কিছু কথা‘আয়ু’ শব্দের অর্থ ‘জীবন’এবং ‘বের্দ’ শব্দের অর্থ ‘জ্ঞান’ বা ‘বিদ্যা’।  ‘আয়ুর্বেদ’ শব্দের অর্থ জীবনজ্ঞান বা জীববিদ্যা। অর্থাৎ যে জ্ঞানের মাধ্যমে জীবের কল্যাণ সাধন হয় তাকে আয়ুর্বেদ বা জীববিদ্যা বলা হয়।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসা বলতে ভেষজ বা উদ্ভিদের মাধ্যমে যে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে বোঝানো হয়। এই চিকিৎসা ৫০০০ বছরের পুরাতন। আদি যুগে গাছপালার মাধ্যমেই মানুষের রোগের চিকিৎসা করা হতো। এই চিকিৎসা বর্তমানে ‘হারবাল চিকিৎসা’ তথা ‘অলটারনেটিভ ট্রিটমেন্ট’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে এই চিকিৎসা বেশি প্রচলিত। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বেও এই চিকিৎসা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

মূল ধারণা
আয়ুর্বেদ হলো ভারতবর্ষের প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি অঙ্গ। প্রায় ৫০০ বছর আগে ভারতবর্ষেরই মাটিতে এই চিকিৎসা পদ্ধতির উৎপত্তি হয়। আয়ুর্বেদ শব্দটি হলো দুটি সংস্কৃতি শব্দের সংযোগে সৃষ্টি-যথা ‘আয়ুস’, অর্থাৎ ‘জীবন’ এবং ‘বেদ’ অর্থাৎ‘বিজ্ঞান’। যথাক্রমে আয়ুর্বেদ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ‘জীবনের বিজ্ঞান’। এটি এমনই এক চিকিৎসা পদ্ধতি, যাতে রোগ নিরাময়ের চেয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার প্রতি বেশী জোর দেওয়া হয়। রোগ নিরাময় ব্যবস্থা করাই এর মূল লক্ষ্য।

আয়ুর্বেদের মতে মানব দেহের চারটি মূল উপাদান হলো দোষ, ধাতু, মল এবং অগ্নি। আয়ুর্বেদে এগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, তাই এগুলিকে ‘মূল সিদ্ধান্ত’ বা ‘আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মূল তত্ত্ব’ বলা হয়।

দোষ : ‘দোষ’ এর তিনটি মৌলিক উপাদান হল বাত, পিত্ত এবং কফ। যেগুলি সব একসঙ্গে শরীরের ক্যাটাবোলিক ও এ্যানাবোলিক রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এই দোষগুলির প্রধান কাজ হল শরীরের হজম হওয়া পুষ্টির উপজাত দ্রব্য শরীরের সমস্ত স্থানে পৌঁছে কোষ, পেশী ইত্যাদি তৈরিতে সাহায্য করা। এই দোষগুলির জন্য কোনো গোলযোগ হলেই তা রোগের কারণ হয়।

ধাতু : ধাতু হলো তাই, যা মানব দেহটিকে বহন করে। আমাদের দেহে সাতটি টিস্যু সিস্টেম আছে। যথা রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র। ধাতু দেহের প্রধান পুষ্টি যোগায় এবং মানসিক বৃদ্ধি ও গঠনে সাহায্য করে।

মল : মল অর্থাৎ শরীরের নোংরা বর্জ্য পদার্থ বা আবর্জনা। এটা হলো শরীরের ত্রয়ীর মধ্যে দোষ ও ধাতু ছাড়া তৃতীয়। মল প্রধানতঃ তিন প্রকার-যথা মল, প্রস্রাব ও ঘাম। দেহের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য মলের বর্জ্য পদার্থ শরীরের বাইরে বেরোনো অত্যন্ত জরুরী। মলের দুটি প্রধান দিক আছে, মল ও কিত্ত। মল হল শরীরের বর্জ্য পদার্থ এবং কিত্ত হল ধাতুর আবর্জনা।

অগ্নি : শরীরের সমস্ত রাসায়নিক ও পাকসংক্রান্ত কাজ হয় অগ্নি নামক দৈহিক আগুনের সাহায্যে। আমাদের লিভার এবং টিস্যু কোষে উৎপন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ বিশেষকে অগ্নি নামকরণ করা হয়।

আয়ুর্বেদে রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি
আয়ুর্বেদে রোগীর শারীরিক ও মানসিক সম্পূর্ণ অবস্থার বিচার করে তবেই রোগ নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসক আরও কিছু বিষয়ে ধ্যান দেন, যেমন: রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, হজমের ক্ষমতা, কোষ, পেশী ও ধাতু ইত্যাদি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও অনুধাবন করেন আক্রান্ত শারীরিক টিস্যুগুলি, ধাতু, কোন জায়গায় রোগ স্থিত, রোগীর রোধক্ষমতা, প্রাণশক্তি, দৈনন্দিন রুটিন, রোগীর ব্যক্তিগত, সামাজিক, ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা ইত্যাদি।

রোগ নির্ণয়ের জন্য আরও কয়েকটি পরীক্ষার দরকার হয়। সেগুলো হলো: সাধারণভাবে শারীরিক পরীক্ষা, নাড়ীর স্পন্দন পরীক্ষা, মূত্র পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, জিহ্বা এবং চোখ পরীক্ষা, চামড়া এবং কান পরীক্ষা, স্পর্শনেন্দ্রিয় এবং শ্রবনেন্দ্রিয় এর ক্রিয়াকলাপ পরীক্ষা।

চিকিৎসা পদ্ধতি
আরোগ্য বিদ্যার মূল কথাই হল যে সেটাই সঠিক চিকিৎসা যা রোগীকে সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে দেয় এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক যিনি রোগীকে রোগমুক্ত করেন। আয়ুর্বেদের মূল উদ্দেশ্য হল স্বাস্থ্যরক্ষা ও তার উন্নতি, রোগরোধ ও তার সঠিক নিরাময়।

চিকিৎসার প্রধান বিষয় হলো শরীরের পঞ্চকর্মের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে তা রোধ করে পূর্বাবস্থায় ফেরানো। ওষুধ, পুষ্টিকর খাদ্য, জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে শরীরে উপযুক্ত শক্তি যুগিয়ে এটা করা সম্ভব যাতে ভবিষ্যতেও রোগ প্রভাবিত করতে না পারে।

রোগের চিকিৎসা সাধারণত সঠিক ওষুধ, খাদ্য ও উপযুক্ত ক্রিয়াকলাপ দ্বারা করা হয়। উপরে তিনটির প্রয়োগ দুই রকমভাবে করা হয়। একটা পদ্ধতিতে উপায় তিনটি রোগের এটিওলোজিক্যাল বিষয়সমূহ এবং প্রকাশের বিরুদ্ধতা করে আক্রমণ করে। দ্বিতীয় পদ্ধতিটিতে ওষুধ, খাদ্য এবং ক্রিয়াকলাপকে ঐ তিনটি উপায়কেই এটিওলোজিক্যাল বিষয়সমূহ এবং প্রকাশের একই প্রভাবের জন্য লাগানো হয়। এই দুই ধরনকে বলা হয় ভিপ্রীতা এবং ভিপ্রীতার্থকারী চিকিৎসা।

সফল চিকিৎসা প্রদানের জন্য চারটি জিনিষ অবশ্য প্রয়োজনীয়। সেগুলো হলো : চিকিৎসক, ওষুধ, পরিষেবিকা এবং রোগী।

গুরুত্বের দিক দিয়ে প্রথম স্থান চিকিৎসকের। তার যথাযথ ব্যবহারিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, মানবিক বোধ ও সুদ্ধ মন অত্যন্ত জরুরি। তার চিকিৎসাবিদ্যাকে যথেষ্ট নম্রতা ও বিদগ্ধতার সঙ্গে মনবজাতির কল্যাণে ব্যয় করা উচিৎ। খাদ্য ও ঔষধের গুরুত্ব এর পরেই আসে। এগুলি অতি উন্নত মানের, সঠিক পদ্ধতিতে তৈরি এবং সর্বসাধারণের জন্য, সর্বত্র পাওয়া যাওয়া উচিৎ। আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদেরকে কবিরাজ বলা হয়।

সব সফল চিকিৎসার তৃতীয় উপাদান হল সেবাদানকারী। যাদের সেবার ভাল জ্ঞান থাকা উচিৎ, কাজের দক্ষতা থাকা উচিৎ, পরিচ্ছন্ন ও প্রায়োগিক জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এর পরে আসে রোগীর ভূমিকা, তাকে যথেষ্ট বাধ্য ও সহযোগিতাপূর্ণ হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মত চলা উচিৎ। রোগ সম্পর্কে বলতে পারা উচিৎ এবং চিকিৎসার জন্য যা সহায়তা দরকার দেওয়া উচিৎ।

রোগ শুরুর বিভিন্ন উপসর্গ থেকে শুরু করে পুরোপুরি প্রকাশ পর্যন্ত নানা কারণগুলির বিশ্লেষণের জন্য আয়ুর্বেদের সুস্পষ্ট নিয়মাবলী বা বিবরণ আছে। এর মাধ্যমে রোগের গোপন উপসর্গের পূর্বাভাসের আগেই তার আবির্ভাব সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। যেটা আয়ুর্বেদের বিশেষ সুবিধা। এর ফলে রোগের গোড়া থেকেই ওষুধের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা বা পরে রোগের তীব্রতাকে রোধ করে যথাযথ আরোগ্য বিদ্যার প্রয়োগে পীড়ার প্রকোপকে সমূলে বিনাশ করা যায়।

সোর্সঃ ইন্টারনেট

No Responses

Write a response