“ আমার ছোট মেয়ে মারুফা”

“ বিয়ে মানবব্জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সৃষ্টির শুরু থেকে আবাহমান কাল ধরে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সমাজে বিবাহের গুরুত্ব অনেক বেশি। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে এ বিবাহ মানবব্জীবনকে করে ‘সাফল্যমন্ডিত’। কিন্তু বাল্যবিবাহ জীবনে এনে দেয় ধ্বংস, শান্তির নামে যে সুখের সংসার গড়ে ওঠার যে স্বপ্ন দেখে বাল্যবিবাহের কারণে তা হয়ে যায় অংকুরে বিনষ্ট।
সভ্যতা ও কালের বিবর্তনে পরিবর্তন হয়েছে কত কিছু, মানুষ চলেছে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে, কিন্তু এখন ও রয়ে গেছে বাল্য বিবাহের প্রচলন । যার কারনে সমাজে , দেশে আজ অশান্তির দাবানল জ্বলছে দাউ দাউ করে। বাল্য বিবাহের এ বাস্তব প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিবার সমাজে তথা এই জাতি অনেক সুন্দর স্বপ্ন ভেঙ্গে কি ভাবে পাড়ি দিতে হয় জীবন নদীর ওপারে তারই একটি ছোট গল্প।“

“ আমার ছোট মেয়ে মারুফা”
মোঃ মাসুদ রানা (রায়হান)

ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর থানার এক নিভৃত পল্লী ছায়াঘেরা সুনিবিড় গ্রাম মেদনীসাগর, এ গ্রামের অসংখ্য মানুষ ভূমিহীন কৃষক, খুব কষ্টের সাথে দিনাতিপাত করলে ও এ গ্রামের মানুষেরা সন্ধ্যা বেলায় চায়ের দোকানে জমিয়ে আড্ডা দেয়ার যে প্রবনতা সে আদিকাল থেকেই যেন চলে এসেছে। এক কাপ গরম চা আর নানা হাস্য রসিকতার মধ্যে দিয়েই সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততার অবসান ঘটায়। এ গ্রামে শিক্ষার আলো প্রবেশ করলে ও এখনো মানুষের মনের অন্ধকার গোঁড়ামি , কুসংস্কার দূর হয়নি। তাই ত বাপ দাদার প্রাচীন নিয়ম নীতি অনুসরণ করে নষ্ট করছে অনেক সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। যেমনটি দিতে হয়েছে সাহাবুদ্দীন চাচাকে। তিন কন্যা ও স্ত্রী নিয়ে সাজানো সুখের সংসার। বাবার মৃত্যুর সময় এক কাঠা জমিও রেখে যেতে পারেনি। তাই সাহাবুদ্দিন চাচা নিজ পরিশ্রমে হাড় ভাঙ্গা খাটুনী দিয়ে তিলে তিলে গড়ে এই কষ্টের সংসার। তবু অভাব যেন লেগেই থাকত। শতো অভাবের মাঝেও সাহাবুদ্দীন চাচা ও তার স্ত্রী সাবিনা বেগম সন্তানদের কখন ও খাবারের অভাব বুঝতে দেয়নি। সাহাবুদ্দীন চাচা মেয়েদের পড়াশুনার প্রতি অমনোযোগী হলে ও মা সাবিনা বেগম পড়াশুনা তেমন একটা না জানলেও তিনি চান মেয়েরা যেন স্কুলে যান। দু এক কলম পড়া লেখা জানুক।
বড় মেয়ে মাহমুদা জন্ম থেকেই বাম পা খোঁড়া। জন্মের ২ বছর পর আধো আধো কথা বললে ও পরবর্তীতে তা অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অনেক ডাক্তার কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করে ও তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনা যায়নি। তাই মাহমুদা স্কুলে যেতে পারেনা। সবার সাথে বউ-বউ, এক্কা-দোক্কা খেলতে পারেনা। বরং মাহমুদা ডান পা দিয়ে যতটা পারা যায় পুরো আঙ্গিনায় বিচরণ করে।
২য় মেয়ে আশরাফি মাহমুদার দেখাশুনাটাই বেশি করত। কখনো কখনো বাবার সাথে মাঠে যেতে হয় তাকে।বাবা কাজের জন্য বাইরে গেলে ১৩ বছরের এই আশরাফিকে বাবার অনুপস্থিতিতে কত কাজ করতে হয়। গোয়াল ঘর থেকে গরু ছাগল বের করে তাদের কে খাইতে দেয়া মায়ের সাথে গৃহস্থের নানা কাজে সাহাযা করা আবার ৯ টা বাজলে স্কুলে যাওয়া । স্কুল থেকে বাড়ি এলে খাওয়ার কোন কিছু থাকলে খেত। আর না থাকলে আবার মাঠে গিয়ে গরু ছাগল নিয়ে আসা; বিকেল বেলা হাটে গিয়ে কিছু তরকারী , চাল, ডাল ক্রয় করা এরূপ নানা সংসারের কাজ এতটুকু মেয়েটার দ্বারা হত।
অভাবের সংসারে আশরাফির এই মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়াটা তার বাবার বড় অপছন্দের। সে চাই আশরাফি তার সাথে মাঠে কাজ করে সংসারের আয়টা একটু বাড়ুক। বড় মেয়ে মাহমুদা প্রতিবন্ধীর কারনে সে কোন কিছু করতে অক্ষম। মা সংসারের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত । আশরাফি ও তার বাবার আয়ে চলছে কোন রকম পরিবারটা।
সাহাবুদ্দীন চাচার ছোট মেয়ে মারুফা প্রাইমারী শেষ করে এবার মাধ্যমিকে । চঞ্চল, চপলা মেয়ে মারুফা সকাল হলেই তার বই নিয়ে পরতে বসা , বন্ধুদের সাথে খেলতে যাওয়া , স্কুলের সময় হলে স্কুলে যাওয়া । মারুফা যেমন চঞ্চল, চপলা উদাসীন মেয়ে তেমনি আবার মেধাবী। প্রাইমারীতে বৃত্তি পেয়েছে। অভাবের সংসার হলেও মারুফার আগ্রহ তার মায়ের সহযোগিতা আর শিক্ষকদের উৎসাহে মারুফা পড়াশুনায় মনোযোগী হয়।
তবুও যেন তার চঞ্চল মন স্থির হয়না। মুক্ত পাখির মত ঘুরে বেড়াই এখান থেকে ওখানে, এ ডাল থেকে ও ডালে। বিকেল হলেই আবার এ পাড়া থেকে ও পাড়া হালকা পাতলা বদন খানি তার চোখে যেন এক গুচ্ছ স্বপ্ন । তার চঞ্চল , চপলতার মাঝেও ছিল সুপ্ত মন। বাব মা এর প্রতি আলাদা এক শ্রদ্ধা। বাবা তার এ চঞ্চল, চপলতা, স্কুলে যাওয়াটা পছন্দ করত না। বলেই তাকে অনেক আঘাত করত। তারপর ও মারুফা , তার বাবার এ অকথ্য নির্যাতন চোখ-বুজে সহ্য করে সে তার পড়াশুনা করত। মারুফার স্বপ্ন সে ডাক্তার হবে। ডাক্তার হয়ে এ গ্রামে তার বড় বোন মাহমুদার মত যত প্রতিবন্ধী আছে সে তাদের ফ্রী চিকিৎসা করাবে। যারা টাকার অভাবের কারনে ভাল চিকিৎসা পায়না। সে তাদের সেবা করবে। এমনই এক লালিত স্বপ্নে বিভোর ছিল। ১১ বছরের মেয়ে মারুফা। বয়স অল্প হলেও স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া।
ক্লাসে স্যার বলতেন তোমাদের স্বপ্ন হতে হবে পাহাড় সমান উঁচু। ‘আমি পারব, আমাকে পারতে হবে’ এ বিশ্বাস রাখবে মনের মাঝে। স্যারের এ সব কথা তাকে আরও অনুপ্রানিত করে। দিন আসে দিন যায় তবুও সাহাবুদ্দিন চাচার অভাব যেন লেগেই আছে। এ দিকে আশরাফির বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। অভাবের সংসারে আশরাফি চায়না এই অল্প বয়সে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে । পাত্র খাস, খেরস্থ , জমিজমা আছে। খুব সুখে থাকবে আশরাফি। এ রূপ নানা কথা বলে সাহাবুদ্দীন চাচার মনের পরিবর্তন ঘটান ঘোটক, বাবু মিয়া। সাহাবুদ্দীন চাচা ও খুব পছন্দ করলেন ঘোটকের কথা শুনে এমন জামাই মোটেও হাতছাড়া করা যাবেনা। সব শেষে যৌতুকের দাবিটা একটু বেশি উঠলেও সাহাবুদ্দিন চাচা প্রস্তাবে রাজী হন। গ্রামের দাঁড়িপাকা মুরুব্বিরা বলে , ‘এত অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেয়ার কাজটা কি ভাল হল, সাহাবুদ্দিন?’ সাহাবুদ্দিন চাচা বলে, ‘আমার ভাল মন্দ আমি বুঝি , আপনাদের এত মাথা ব্যথা কিসের?’
বিয়েতে মত না থাকলেও আশরাফি তার বাপ-মায়ের দিকে তাকিয় নীরবে রাজী হয়। খুব ধুম-ধাম করে বিয়ের আয়োজন হয় বাড়িতে । সবাই ব্যস্ত সময় পার করছে। মারুফা ও বোনের এই বিয়ের আনন্দে সারা বাড়ি নেচে বেড়াই। সাহাবুদ্দিন চাচা ও তার স্ত্রী সাবিনা বেগম বাড়ির এক কোনে বসে নীরবতা পালন করছে। আশরাফি চলে যাবে পরের ঘরে। বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগবে। আয়ের পরিমাণ ও কমে যাবে। বাবার সাথে আর কাজ করবেনা। কিভাবে একা একা এ পরিবারটা সামাল দিবে ? এরুপ চিন্তায় বসে আছে তারা। মহমুদার পঙ্গুত্বের কারনে তাকে অনেকে বিয়ে করতে রাজী নন। আর কেউ রাজী হলেও যৌতুকের দাবিটা অনেক বেশি চাই। যা সাহাবুদ্দিন চাচার পক্ষে অসম্ভব। তাই মাহমুদার পরিবর্তে আশরাফির বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হল। এত অল্প বয়সে আশরাফির বিয়ে ঘর –সংসার করছে ভাবতে ও অবাক লাগে। দেখতে দেখতে বছর খানেক পেরিয়ে গেল। এখন ও যৌতুকের পুরো টাকা দিতে অসমর্থ সাহাবুদ্দিন চাচা। আশরাফির বিয়ের পর থেকে সাহাবুদ্দিন চাচা কেমন যেন ভেঙ্গে পড়েন। মেয়ের বিয়ের ১৫ হাজার টাকা দিতে পড়ে আছে।
এ দিকে বাড়িতে মাহমুদা ও মারুফার নানা আবদার । আর সংসারের খরচ চালাতে হিমসিম খেয়ে পড়ছেন সাহাবুদ্দিন চাচা। মাহমুদার স্কুলের বেতন ও অন্যান্য খরচ সাহাবুদ্দিন চাচার বিরক্তিকর ভাব প্রকাশ করে। তবুও মারুফা আনন্দে ডানায় ভর করে নিজ মনে পড়াশুনা করে। স্কুলের স্যারেরা তাকে খুব ভালবাসে। তার প্রশংসা করে। এতে মারুফার যেমন ভাল লাগে তেমনি ভাল লাগে তার বাবা-মায়ের । অভাবের সংসারে দুঃখ ও যেন সুখে পরিনত হয়।
জ্যৈষ্ঠ মাস। আম , কাঁঠালের এ ভরা মৌসুমে আশরাফি এসেছে বাপের বাড়িতে । দীর্ঘ দিন পরে এসে যেন সব কিছু নতুন লাগে। বড় বোন মাহমুদার দিকে তাকিয়ে রইল আশরাফি। আগের মত আর মাহমুদার দেখাশুনা করতে পারেনা আশরাফি। ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল মাহমুদা। মনের মাঝে জমে থাকা আবেগ, ভালবাসা যেন টই-টুম্বর হয়ে আছে। একটু নাড়া দিলেই যেন পড়ে যায়। শশুর-শ্বাশুড়ির কিছু আচরণ আর ১৫ হাজার টাকা দাবি থাকায়, স্বামীর অকথ্য , নিষ্ঠুর আচরণ আশরাফিকে যে কতটা অমানুষিক নির্যাতনে রেখেছে তা মা সবিনা বেগমের বুঝতে বাকি নেই। কত বার বললাম , ‘এতটুকুন মেয়েতাকে বিয়ে দিবনা। সে কি বোঝে স্বামীর সংসার? কিভাবেই বা তার যৌতুকের টাকা শোধ দিব?’
তখন ত বললেন, ‘কোন একটা ব্যবস্থা করা যাবে। এখন দেখছেন; মেয়েটার অবস্থা কি? সময় মত যৌতুকের টাকা না দেয়ায় গরুর মত মেয়েতাকে খাটায়, অত্যাচার করে। এ সবের জন্য আপনি দায়ী?’ এমন আবেগে আপ্লুত হয়ে, ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে বলছেন স্ত্রী সাবিনা বেগম তার স্বামীকে। স্বামী সব কিছুনীরবে সহ্য করছেন। কোন প্রতিত্তোর করছেন না।
বাপের বাড়িতে এসেই যেন আশরাফি বেশি স্বস্থিবোধ করছেন। তবু স্বামীর বাড়ি মেয়েদের আসল ঠিকানা। বেশ কয়েক দিন থাকার পর আশরাফি আবার স্বামীর বাড়ির পথে রওনা হলেন। যাওয়ার সময় বার বার অশ্রু-সিক্ত নয়নে , সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আশরাফি। নিস্পলক চাহনিতে মাহমুদা দেখে আছে । কিছু বলতে চাইলেও যেন কথা বের হয়না। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আশরাফি চলে গেল স্বামীর বাড়িতে। মা সাবিনা বেগমের দেয়া কিছু আম, কাঁঠাল আশরাফির হাতে দেখে খুশি হলেন তার শ্বাশুড়ি। বউমার বাপের বাড়ির গাছের আম ও কাঁঠাল খেতে খুব ইচ্ছে ছিল এমন মধুর কথা বলে আশরাফিকে সান্ত্বনা দিলেও যৌতুকের টাকা না আনার কারনে চালে নানা রকম যুলুম ও নির্যাতন।
একটা শক্ত ব্যামো এসে আশরাফিকে বার-বার দুর্বল করে তোলে। এমন সময় মেয়েদের এসব একটু হয়। একটা জীবন্ত মানুষের পেটে আরেকটা জীবন্ত সন্তান নড়াচড়া করছে। তার পুষ্টির বেশি প্রয়োজন। দৈহিক গঠন ও বয়সের তারতম্যের কারনে অনেকটা চাপ সহ্য করতে হয় আশরাফিকে। সামনে আষাঢ় মাস পড়লেই আশরাফি সন্তানের মা হতে চলেছে। একজন গর্ভবতী মহিলার কী সেবা, পরিচর্যা করা দরকার , কতটা বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন , ভারী কোন জিনিস উত্তোলন না করা, এরূপ কোনটাই হচ্ছেনা আশরাফির। তার পরিবারের লোকজন তাকে হেয় করে অবহেলায় ফেলে রাখে। খবর পেয়ে মা সাবিনা বেগম যান মেয়ের বাড়িতে। মেয়ের শারিরিক অবস্থা আগের থেকে কিছুটা দুর্বল। হালকা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। মেয়ের চিকিৎসা করতে বললে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ী বলে ওঠে, ‘কত টাকা দিয়ে মেয়েকে পাঠিয়েছেন যে চিকিৎসা করাতে বলেন?’ মা সাবিনা বেগম কোন কথা না বলে নীরবে চোখের পানি ফেলে বাড়ি ফিরে এলেন। অসুস্থ্য মেয়ের এ দৃশ্য দেখে আর সহ্য করতে পারলেন না।
আশাঢ় এর কোন এক ঝড়ের রাতে আশরাফির প্রসব বেদনা উঠলে স্বামী তার কোন রকম ব্যবস্থা নেয়নি। প্রসব বেদনা নিয়ে আশরাফি একা বিছানায় ছটপট করছে। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার। আকাশে বিদ্যুতের চমকানি। এমন সময় কোন ডাক্তার, কবিরাজের কাছে যাওয়া ও সম্ভব নয়। দীর্ঘ ক্ষণ একাকী বাচ্চা-প্রসবের বেদনায় ছটপ্ট করে অবশেষে চিরনিদ্রায় শায়িত হল। নীরবে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ল। সাক্ষী হয়ে থাকল আষাঢ়ের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝড়ের রাত। পাষান্ড স্বামীর নিষ্ঠুর আচরণে অকাতরে নিজের জীবন বিসর্জন দিল আশরাফি। স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে গেলো না ফেরার দেশে। অল্প বয়সে বিয়ে সন্তান ধরণ করা আবার অল্প বয়সে এই পৃথীর মায়া ছেড়ে চলে যাওয়া বড় কষ্টের কথা। রাতের ঘোর অমানিশা কেটে পূর্ব আকাশে লাল সূর্যের উদয় হল ঠিকই কিন্তু চলে গেলো সাহাবুদ্দিন চাচা ও স্ত্রী সাবিনা বেগমের আদরের কন্যা। স্বামীর বাড়ির লোকদের নিষ্ঠুর আচরণ আর মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে সুখের স্বপ্নের মোহ কেটে যে দূঃখের রাত নেমে এল তা আর বলার নয়। দেখতে দেখতে কয়েক বছর কেটে গেলো। পরিবারে এখন মারুফাই বাবার সকল কাজে দেখাশুনা করে।
শত ব্যস্ততা ও কাজের ফাঁকে মারুফা তার স্কুল যাওয়া চালিয়ে যায়। তার অনেক বড় স্বপ্ন। স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে পরিশ্রম করতে হবে। মারুফা তাই করে যাচ্ছে। কিন্তু তার বাবার মনে কেন জানি সংশয় লেগেই থাকত। কবে মারুফাকে অন্যের ঘরে পাত্রস্থ করতে পারব? ভাল একটা ছেলে দেখে মেয়েকে বিয়ে দিলে এক্তু চিন্তা মুক্ত হতে পারি। এটা কখন ও ভাবেনা যে মেয়ের বয়স কত? তার বিবাহ দেয়ার মত বয়স হয়েছে কি না? পাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত লোকের এসব ভাবার সময় নেই। শুধু মেয়েকে কোন মতে জোর জুলুম করে বিয়ে দিতে পারলেই ছুটি। সাহাবুদ্দিন চাচা ও তার ব্যতিক্রম নয়। বয়স হয়েছে নিজের ও । সংসারের রোজগারের কোন ব্যবস্থা ও নেই। মারুফার পড়াশুনার খরচ ও কম নয়। এত কিছু মাথায় চিন্তা রেখে ঘুম ও হয়না ভালমত। সাহাবুদ্দিন চাচার এ সব চিন্তা ছাড়া আর কিছু নাই।
এ গ্রামে মারুফার খুব সুনাম। পড়াশুনায় ভাল। মস্টাররা তাকে কোন কিছুতেই নিরুৎসাহিত করেনা। তার মেধা তাকে ভাল কিছু করতে সাহায্য করবে। বাবা বৃদ্ধ হলেও ভাল মন্দ বোঝান। কিন্তু অভাব ও কঠিন ব্যস্ততার কাছে অনেক সময় অনেক নীতি ও আদর্শ হার মেনে যায়।
অনেক দিন পরের কথা । মারুফার বিয়ের কথা বার্তা চলছে। কোন যৌতুক ছাড়ায় পাত্র পক্ষ বিয়ে করবে। দিন তারিখ ধার্য করার অপেক্ষায়। এ সব কথায় মারুফার মাথায় বাজ পড়ল। নির্বাক হয়ে চোখ থেকে পানি পড়ে মারুফার। তার সব বন্ধু-বান্ধবীরা স্কুল যাবে। তার আর যাওয়া হবেনা। এমন কথা মারুফা ভাবতেই পারেনা। মারুফার স্কুল স্যারেরা এসে কত না বোঝালেন মারুফার বাবাকে। স্যারেরা বললেন, ‘দেখুন চাচা সরকার এখন মেয়েদের লেখাপড়ার অনেক সুযোগ সুবিধা করে দিয়েছেন। মেয়েদের বিভিন্ন বৃত্তি শ্রণির বিভিন্ন বই ফ্রী দেয়া থেকে আর ও নানা প্রকার সুযোগ করে দিয়েছে। তাছাড়া মারুফাকে বিবাহ দেয়াটা কেবল একটা বাল্য বিবাহ। বাংলাদেশ সরকার এ ব্যপারে কোঠর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চাচা আপনি মারুফার এ বিয়ে ভেঙ্গে তাকে পড়ালেখায় উৎসাহ দিন, দেখবেন মারুফা একদিন আপনার নাম এই সমাজে এই দেশে ছড়িয়ে দেবে।
তাছাড়া এই বাল্যবিবাহের কারনে ত আপানার মেয়ে আশরাফির অকালে জীবন দিতে হল। শারিরিক বিকাশ ও মানুষিকভাবে একটা মেয়ে যতক্ষণ না নিজেকে বুঝতে শেখে ১৮ বছর পূর্ণ না হয় ততক্ষণ তার বিয়ে নয়’। এ রূপ অনেক কথা বললে ও সাহাবুদ্দিন চাচার মনের কোন পরিবর্তন হয়নি। মারুফার শত আকুতি মিনতি শুনল না তার বাবা। বিনা যৌতুকে বিয়ে হবে মেয়ের এটাই মনে বড় শান্তি সাহাবুদ্দিন চাচার। যত বড় দামী দামী কথা বলা হোক না কেন এতে তার মন বুঝবে না।
বিয়ের দিন ক্ষণ চলে আসল। আর মাত্র ২ দিন বাকি। মারুফার মনে গেঁথে ছিল যে স্বপ্ন তা আর বাস্তব হলনা। এ গাঁয়ের মেয়েরা যেভাবে স্কুলে যায় ;তার আর যাওয়া হবেনা। চঞ্চল-চপলতার প্রতিক মেয়ে মারুফা আর আগের মত খেলতে বেড়াতে পারবেনা। মুক্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে বন্দি জীবনে যাওয়া ডাক্তার না হওয়া ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হতে হবে মারুফাকে। অশান্ত অস্থির মন নিয়ে বারবার বাবার কাছে আকুল মিনতি করছে। বাবা আমি তোমার ছোট মেয়ে; আমাকে এভাবে পর করে দিওনা। আমি যাবনা মাকে ছেড়ে, আমি যাবনা তোমাকে ছেড়ে পরের ঘরে। তুমি আমাকে মারো কাটো আর যায় করনা কেন, আমি এ বিয়ে করবনা। বাবা আমি পড়াশুনা করব। আমি সবাইকে নিয়ে এ পাড়া থেকে ও পাড়া বেড়াব। ডাক্তার হব। তবু বাবার কর্ণকুহরে আদরের ছোট মেয়ের ডাক পৌঁছালোনা। সে দিন রাতেই বাড়ির পেছনে। বাবলা গাছে দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করল মারুফা। ভোর বেলায় মুয়াজ্জিনের আযান শুনে যখন সবাই নামাজে রওনা হয়, রাস্তার পাশেই তখন দেখে বাবলা গাছে কি একটা ঝুলে আছে। কাছে গিয়ে দেখে এ আর কেউ না আমাদের সাহাবুদ্দিন চাচার মেয়ে মারুফা। মুহূর্তের মধ্যে যেন হৈচৈ পড়ে গেল। গোটা এলাকায় চারিদিকে মানুষের ঢল। কী এক আশ্চর্য ঘটনা! কিভাবে চলে গেল আমাদের সবাইকে পিছনে ফেলে। আমাদের চিরচেনা সেই মারুফা। যার চোখে ছিল আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সাজানো একগুচ্ছ স্বপ্ন।
কি কারনে কেন এই আত্মদান দিতে হল মারুফাকে? এর একটাই জবাব ‘বাল্য বিবাহ’। বাল্য বিবাহের কুফল না জানার কারনে সাহাবুদ্দিন চাচার মত মানুষ আমাদের সমাজে এরকমই একটা না একটা রহস্যের জাল তৈরি করছে। তাদের কারনে তাদের জেদ, আহমিকা আর বল্য বিবাহ সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারনা না থাকায় এরূপ কত মেয়েকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল সোনার ভবিষ্যত।
আজ এই মারুফা ও আশরাফির দুটি প্রাণ অকালে চলে যাওয়ার পিছনে একটি কারন তা হল ; সাহাবুদ্দিন চাচার অজ্ঞতা ও বাল্য বিবাহের কুফল না জানা। ভাল কিছু পাওয়ার আশায় হারিয়ে ফেলতে হচ্ছে এরূপ হাজার হাজার মারুফা ও আশরাফির মত মেয়েকে । অবশেষে, আফশোষ করা ছাড়া আর কিছুই নাই। আজ ও মা সাবিনা বেগম একাকী ঘরের কোণে লুকিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলেন । স্বামীকে যেন এখন ও মাফ করতে পারেন নি।
মারুফার চলে যাওয়ার আগের মুহূর্তে যে আকুল হৃদয়ে ব্যকুল মিনতি করেছিলেন তার বাবার কাছে ; এখন ও যেন সেই ডাক তার মায়ের কানে বাজে। এই বুঝি আমার মারুফা ফিরে এল। কিন্তু না মারুফা আর ফিরবেনা ।
ফিরবেনা মারুফার মত আর ও হাজারো মেয়ে যাদের স্বপ্ন ছিল সুন্দরভাবে বাঁচার সুন্দর মানুষ হওয়ার। ফিরবেনা আশরাফির মত হাজারো প্রসব বেদনায় কাতরানো মহিলা যে বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে অল্প বয়সে ছেড়ে চলে গেছে পৃথিবীর রূপ , রস, গন্ধ; তারা ও সন্তান প্রসব এর পর মা ডাকটা শুনতে চেয়েছিল।
বাল্য বিবাহের কারনে শুধু হরিপুর থানার মেদনীসাগর গ্রামের নয় বরং দেশের এরূপ বহু জায়গায় কত জন কে যে এভাবে যেতে হয় জীবন নদীর ওপারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। সে দিনের পর থেকে সাহবুদ্দিন চাচাকে কথা বলতে শুনিনি। মা শুধু একটা কথাই বলে; ‘আমার ছোট মেয়ে মারুফা; আমার ছোট মেয়ে মারুফা’ এ দেশের মানুষের মন থেকে দূর করতে হবে গোঁড়ামী, কুসংস্কার। জানাতে হবে বাল্য বিবাহের কারনে কি কি ক্ষতির সম্মুখীন আমরা হই। বাল্য বিবাহের কুফল সমাজ থেকে বাল্য বিবাহের প্রচলন দূর করতে পারলে জনগনকে সচেতন নাগরিক হিসেবে ফিরিয়ে আনতে পারলে হয়ত আমরা আগামী দিনে এমন একটি বাংলাদেশ পাবো যেখানে বাল্য বিবাহের কোন চিহ্ন থাকবে না। দেশ হবে সচেতন নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; তৈরি হবে অনেক সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আলোকিত হবে আমাদের সমাজ , আলোকিত হবে আমাদের দেশ, সোনার বাংলাদেশ।
©2017
Composed by Md. Robiul Islam

1

No Responses

Write a response